বাংলাদেশের পুলিশি সংস্কৃতির ঝোঁক: উপনিবেশের দায়

  • সামজীর আহমেদ

পুলিশি আচরণ, অসদাচরণ এবং অপরাধের কারণ হিসেবে ব্যক্তি পুলিশ বা সে যে আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে এসেছে, তাকে দায়ী করার চল দীর্ঘদিনের। ভারতীয় অঞ্চলে আধুনিক পুলিশের গোড়পত্তনের প্রাক্কালেই বৃটিশ কর্তৃক ভারতীয় পুলিশ সদস্যদের ‘নৃশংসতাপ্রিয়’ হিসেবে তকমা দেয়ার চল ছিল। এই তকমা দেয়ার উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় পুলিশকে নৃশংস দেখিয়ে তার সাথে ঔপনিবেশিক আইন ও পুলিশিং এর দূরত্ব নির্মাণ করা এবং উন্নত শাসন হিসেবে ব্রিটিশ শাসনের বৈধতা দান। প্রক্রিয়াটি সম্পর্কে অনুপমা রাওয়ের একটি উক্তি উদ্ধৃত করছি-

যদিও একটা বড় অংশের লেখালেখি দাবি করে যে, ঔপনিবেশিক শাসনের জন্য ভয়ের সংস্কৃতি খুবই প্রয়োজনীয় ছিল। তবুও একদিক থেকে ভারতে ব্রিটিশ শাসন পুলিশি নৃশংসতার বিরোধিতা করেছে। যে কারণে পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর পর (১৮৫৪ সালের নাশিক হত্যাকা-) একটি বিচার বিভাগীয় তদন্ত করা হয়, যা ঔপনিবেশিক প্রশাসনকে দেশীয় পুলিশদের বিরুদ্ধে দাঁড় করায়। ঔপনিবেশিক আইনের দিক থেকে এই চেষ্টাগুলো ছিল অতি নৃশংসতা থেকে দূরত্ব তৈরি এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া, যাতে করে ঔপনিবেশিক শাসনকে উদারনৈতিক ‘আইনের শাসন’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা যায়।

পুলিশি নৃশংসতা ঔপনিবেশিক শাসন কাঠামোতেই জিইয়ে রেখে আবার তার সাথে ঔপনিবেশিক শাসনের দূরত্ব নির্মাণের প্রক্রিয়াটি বেশ কৌতূহলোদ্দীপক। একদিকে এই নৃশংসতা তার শাসনের অবিচ্ছেদ্য ও প্রয়োজনীয় অংশ। অন্যদিকে সেই দায় যদি ব্যতিক্রম বা বিচ্ছিন্ন ঘটনার নামে ভারতীয়দের ঘাড়েই চাপানো যায়, তাহলে ব্রিটিশ শাসনের উদার নৈতিক এবং বৈধ হতে আর সমস্যা থাকে না। সেক্ষেত্রে ব্যক্তির কর্তাসত্ত্বার ওপর সকল দোষারোপ আড়াল করে দেয় প্রাতিষ্ঠানিক বিচ্যুতির আদল তথা সংস্কৃতিকে।

গত শতকের ৬০ এর দশকে সমাজবিজ্ঞানীরা পুলিশিংয়ের সমস্যার গভীরতর বিশ্লেষণ করতে পুলিশ অধ্যায়নে বাঁক নেন ‘পুলিশি সংস্কৃতি’ নামক ধারণার দিকে। এই ধারণাটি বাংলাদেশের পুলিশি ব্যবস্থা বুঝতেও বিশেষ উপযোগী। এই প্রশ্ন উত্থাপন হওয়া জরুরি যে, কতগুলো ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ ঘটলে তাকে নিয়মিত ঘটনা বলা যায়? ঠিক কোন ঘটনাগুলো কেবল ব্যক্তির দ্বারা সংঘটিত অপরাধ নয় বরং একটি সংস্কৃতির উৎপাদন? বর্তমান লেখায় ‘সংস্কৃতি’ শব্দটি ব্যবহৃত হবে নৃবিজ্ঞানীয় সংস্কৃতির সংজ্ঞায়ন অনুসারে। পুলিশের সামগ্রিক পেশাগত জীবনাচরণই পুলিশি সংস্কৃতি। ব্যক্তি কীভাবে পুলিশ হয়ে ওঠে, পুলিশি অসদাচরণ, অপরাধ কোন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি থেকে রসদ সংগ্রহ করে, প্রণোদনা পায়, কাজের ধরন তার পেশাগত ব্যক্তিত্ত্বকে কতখানি আকার দেয়, পুলিশি সংস্কৃতি খোদ পুলিশিংকেই কেমন চেহারা দেয়, কোন কারণে জনগণের কাছে পুলিশের কেমন ছবি তৈরি হয় এবং কেন তৈরি হয়, প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের অন্তরালে কোন অলিখিত নিয়ম পুলিশকে পরিচালিত করে কিনা, এমন আরো অনেক বিষয় পুলিশি সংস্কৃতি পাঠের অংশ। এই লেখায় আমি মূলত বাংলাদেশের পুলিশি সংস্কৃতির দুইটি বিশেষ ঝোঁক বা বৈশিষ্ট্য তুলে ধরব এবং এই ঝোঁকগুলোর সাথে উপনিবেশের সম্পর্ক কেমন তা দেখানোর চেষ্টা করব।

বাংলাদেশের পুলিশি সংস্কৃতির প্রবণতা ব্যাপকভাবে উপনিবেশের অভিজ্ঞতা দ্বারা প্রভাবিত। এটা যেমন পুলিশিং ধারণাটির দর্শনগত দিক থেকে তেমনই কাঠামোগত দিক থেকেও সত্য। ভারতে আধুনিক পুলিশ সৃষ্টির সময় বৃটিশ শাসকদের হাতে তখন পর্যন্ত আধুনিক পুলিশি ব্যবস্থার দুইটি মডেল উপস্থিত ছিল। একটি মডেল হল লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশের, অন্যটি আয়ারল্যান্ডে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল আইরিশ কনসটাবুলারির (আরআইসি) মডেল। প্রথমটি নিজ দেশের জনগণের জন্য সেবাধর্মী চরিত্রের, দ্বিতীয়টি অপর জনগণের জন্য বলপ্রয়োগধর্মী মডেল। ভারতে প্রতিষ্ঠিত মডেলটি কাঠামো এবং দর্শনগত দিক থেকে আরআইসির অনুসারী। ভারতীয় পুলিশ এবং আরআইসি দুই মডেলই অপর জনগণকে জোর করে বশীভূত রাখার জন্য তৈরি। আরআইসি ছিল কেন্দ্রীয় পুলিশি ব্যবস্থা। অন্যদিকে লন্ডন পুলিশ ছিল বিকেন্দ্রিক। পার্থক্যটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা তখনই তৈরি হয় যখন পুলিশের একটা একক প্রধান উদ্দেশ্য থাকে। ভারত বা আয়ারল্যান্ডে তা ছিল ঔপনিবেশক শাসনের স্বার্থরক্ষা। যে কারণে ‘ল এন্ড অর্ডার’ ছিল এই দুই ক্ষেত্রে প্রধান বিবেচনার বিষয়। অন্যদিকে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ ছিল অনেকটা নিরাপত্তা সেবাধর্মী। জনগণের প্রয়োজন দেখাটা সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। ফলে আঞ্চলিক প্রয়োজন গুরুত্ব পেয়েছে এবং ব্যবস্থাটি পরিচালিত হয়েছে স্থানীয় সরকারের অধীনে। এটা সম্ভব হয়েছে কারণ সেখানে কোন কেন্দ্রীয় দায়িত্ব পালন মুখ্য ছিল না।

কাঠামোগত দিক থেকেও ভারতীয় পুলিশ আরআইসির অনুসারী। সফল কাঠামো আসলে উদ্দেশ্যকেই অনুসরণ করে। আয়ারল্যান্ড ও ভারতে পুলিশি কাঠামোর একটা বড় বৈশিষ্ট্য হল ব্যারাকভিত্তিক আবাসন ব্যবস্থা। মূলত সেনাবাহিনী এই ব্যবস্থার জন্মদাতা। জনগণের সাথে বিচ্ছিন্নতা এবং কঠিন গোষ্ঠীভিত্তিক ভাতৃত্ববোধ এই ব্যবস্থার দৃশ্যমান উদ্দেশ্য। জনগণের সাথে মেশা মানে জনগণের অংশ হয়ে পড়া। আর জনগণ ও শাসক যদি আলাদা হয় তবে সেক্ষেত্রে পুলিশের উপর শাসকের নিয়ন্ত্রণতো কমবেই, উপরন্তু অনেকক্ষেত্রে তা বৈরিতারও হতে পারে।

সামজীর আহমেদ

আরআইসি ছিল মূলত আধাসামরিক (প্যারামিলিটারি) আদলের। সামরিক ব্যবস্থাটা এখানে বোঝা জরুরি কারণ এটা বাংলাদেশি পুলিশি সংস্কৃতির একটা বিরাট ঝোঁক। সামরিকতাবাদ মানে কেবল বিশেষ পোশাক, অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ নয়। সামরিকতাবাদ প্রথমত এবং মূলত একটা মানসিকতা যা মনে করে জোর, আধিপত্য ও সহিংসতার হুমকিই হল সমস্যা সমাধানের সবচেয়ে উপযোগী উপায়। এই বিষয়টাকে সংজ্ঞায়নের চেষ্টায় নৃবিজ্ঞানী পিটার ক্রাসকা বলেন,

It is a set of beliefs, values, and assumptions that stress the use of force and threat of violence as the most appropriate and efficacious means to solve problems…To militarize means adopting and applying the central elements of the military model to an organization or particular situation.

শরীরে ও মগজে পুলিশের সামরিকীকরণ প্রথম শুরু হয় আয়ারল্যান্ডে ও পরে ভারতে। বৃটিশ শাসনের জন্য এই সামরিকীকরণ আদর্শগত ও কৌশলগত কারণেই প্রয়োজন ছিল। কিন্তু অন্তত বাংলাদেশকালে পুলিশি সংস্কৃতির এই ধরণ পরিবর্তিত হয়ে আধা সামরিক পুলিশের বদলে কৌশলী ও সেবাধর্মী পুলিশিং প্রচলিত হতে পারত। বিষয়টা এমন না যে, বাংলাদেশ পুলিশে সেবা যুক্ত হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ভিকটিম সাপোর্ট সেন্টার, পুলিশ ক্লিয়ারেন্স ওয়ান স্টপ সার্ভিস, সুরক্ষা অ্যাপ, লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড অ্যাপ, নারী ও শিশু ডেস্ক, কমিউনিটি সেবা এমন অনেকগুলো বিষয় যুক্ত হয়েছে। কিন্তু বৃহত্তর রাজনীতির ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণের পরিবর্তন ছাড়া পুলিশি সংস্কৃতির মৌলিক পরিবর্তন অসম্ভব। অর্থাৎ সেবার ধারণা মুখ্য হওয়া অসম্ভব। ঔপনিবেশিক সামরিকতাবাদ তাই এখনো পুলিশের সংস্কৃতির প্রধানতম ঝোঁক।

ঔপনিবেশিক সামরিকতাবাদ তাই এখনো পুলিশের সংস্কৃতির প্রধানতম ঝোঁক।

দুনিয়ার অন্যান্য দেশের মতোই বাংলাদেশের পুলিশের একটা বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অতি কর্তৃত্বপ্রবণতা। ২০১৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথম আলো পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে পাওয়া যায়, মাগুরার সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কর্তৃক সেলুনে সেলুনে একটি বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়- “কোন প্রকার মডেলিং চুল কাটা, দাড়ি কাটা ও বখাটে কাটিং করা যাবে না”। আরেকটা ঘটনা উল্লেখ করা যাক। ২০২০ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি বাংলা ট্রিবিউনে প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ ঘাট থানার ওসির কক্ষের প্রবেশমুখে ঝুলানো এক অদ্ভুত ব্যানারের কথা। এই ব্যানারে বলা হয় “ইহা একজন গণ কর্মচারীর অফিস। যে কোনো প্রয়োজনে এই অফিসে ঢুকতে অনুমতির প্রয়োজন নাই। সরাসরি রুমে ঢুকুন। ওসি’কে স্যার বলার দরকার নাই।” পত্রিকাটির প্রতিবেদককে ব্যানারের ব্যাপারে ওসি আশিক বলেন “আমি খেয়াল করেছি মানুষ ওসির রুমে ঢুকতে ইতস্তত বোধ করে, ভয় পায়। অনেক সময় অনুমতির জন্য ঘোরাফেরা করে। এতে জনগণের সঙ্গে একটা দূরত্ব থেকে যায়। আমি প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। মানুষ আমাকে তাদের একজন ভাববে এটাই আমি চাই। তাই রুমের বাইরে ওই লেখা টাঙিয়েছি”।

২৭ ডিসেম্বর ২০২০, প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায়, একজন ডাক্তার একজন নাপিতকে বিয়ে করায় রংপুর সিআইডি পুলিশের পুলিশ সুপার “সমাজের চোখ খুলে দেয়ার” জন্য একটি সংবাদ সম্মেলন করেন। পুলিশের অনেক উর্দ্ধতন কর্মকর্তা ঘটনাটির সমালোচনা করেছেন। কিন্তু আদতে কি এটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা? অপরাধ প্রমাণের আগে সংবাদ সম্মেলন, আইন-অতিরিক্ত পুলিশি আচরণ এবং জবরদস্তির মানসিকতা যে সাংস্কৃতিক আবহ সৃষ্টি করে। তাতে এই ঘটনা অস্বাভাবিক নয়। বরং তারাই ব্যতিক্রম, যারা ঘটনাটির সমালোচনা করেছেন। 

Police Surveillance; Plop & KanKr; Cartoonist Movement

অতি কর্তৃত্ব বিষয়টির সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগ রক্ষণশীলতার। রক্ষণশীলতা কারণ হলে কর্তৃত্ব তার ফল। এই রক্ষণশীলতা হল পুলিশের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। মূলত জনগণের ভিন্ন ভিন্ন গোষ্ঠী, তাদের সংস্কৃতি ও উপ-সংস্কৃতি সম্পর্কে ধারণা না থাকা ব্যাপক গোঁড়ামির জন্ম দেয়। এই কারণে প্রথম উদাহরণে কেবল বখাটে কাটই নয়, মডেলিং কাটও পুলিশি হুকুমদারির আওতাভুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় উদাহরণও একটু ভিন্ন ভাবে পুলিশি কর্তৃত্বচর্চারই সাক্ষ্য দেয়। যিনি ব্যানার লাগিয়েছেন, তিনি অবশ্যই জনগণের সেবা করতে চেয়েছেন আন্তরিকভাবে। কিন্তু যা স্বাভাবিক একটা বিষয় হওয়ার কথা ছিল, তা যখন ব্যানারে ঘোষণা দিয়ে বলতে হয় তখন বুঝা যায় যে, কোন অস্বাভাবিক সংস্কৃতিতে এমন স্বাভাবিকতার বিজ্ঞাপন দিতে হয়। পুলিশের অতি কর্তৃত্বকে জেরেমি স্কলনিক অবশ্য পুলিশের ওয়ার্কিং পারসোনালিটি বা পেশাগত ব্যক্তিত্যের সাথে যুক্ত বলে মনে করেন। পেশার ধরনের কারণেই পুলিশকে সম্ভাব্য বিপদ সম্পর্কে সর্তক থাকতে হয়। যা তার পেশাগত ব্যক্তিত্যকে সন্দেহপ্রবণ করে। ফলস্বরূপ এই সন্দেহপ্রবণতা তাকে অতি কর্তৃত্বের দিকে ঠেলে দেয়। স্কলনিক মূলত সমস্যাটির সাংগঠনিক বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু আমি মনে করি প্রাক্তন উপনিবেশগুলোতে সমস্যাটির একটি ভিন্ন চরিত্র আছে। ঔপনিবেশিক সময়ে পুলিশের ভাবমূর্তি কেমন ছিল তা জানাটা এখানে প্রাসঙ্গিক। ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার পুলিশি ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করেছেন পুলিশ বিশেষজ্ঞ পিটার রব। উপনিবেশিত বাংলার পুলিশের ভাবমূতি সম্পর্কে রবের বর্ণনা তুলে দিচ্ছি,

The functions of the British police establishment in the first half of the nineteenth century were designed more to maintain order and to impress the population than to investigate crime. The police inspector, as George Campbell remarked in 1852, affected a ‘judicial’ (rather) than a thief catching character; typically obese clad in fine linen, carried about in a palanquin, he reacted to serious crime by writing a report and then proceeding to the scene and holding court. Thus the British proclaimed the theory of state’s responsibility for many transgressions against person and property, but their practice in Bengal was rather to give a show when necessary as a marker of the importance and supremacy of the state; its interests, of course, especially in regard to revenue payment, were pursued rigorously.

রবের বর্ণনার দুইটি দিক খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্রিটিশ আমলের বাংলায় পুলিশিং কখনোই বিচারিক আদালতে পৌঁছানোর উপায় ছিল না। বরং পুলিশ নিজেই ছিল আদালত। অন্যদিকে, সেবার চেয়ে প্রদর্শন বা নির্দিষ্টভাবে বললে, ক্ষমতা প্রদর্শনই ছিল মূল কথা। ফলে পুলিশের মূখ্য পরিচয় নিরাপত্তা-সেবা বাহিনী না হয়ে, হয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

অতি কর্তৃত্বের পাশাপাশি পুলিশি সংস্কৃতির আরেকটি বৈশিষ্ট্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ তা হল ‘পুলিশি একতাবোধ’। কোন গোষ্ঠীর মধ্যে একতাবোধ থাকা সমস্যাজনক কিছু নয়। কিন্তু এই একতাবোধ যদি সমালোচনা বা আত্মসমালোচনার পথ রুদ্ধ করে এবং গোষ্ঠীর সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত অপরাধ ঢাকতে এবং উপরন্তু তা উৎসাহিত করতে সাহায্য করে তখন একতাবোধ একটি ব্যাপক সমস্যা হিসেবে হাজির হয়।

পুলিশি একতাবোধ ৩টি কারণে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।

১. পুলিশি একতাবোধ প্রায় সময় দুর্নীতিগ্রস্থ বা অপরাধী পুলিশকে রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।

২. এই একতাবোধ ব্যক্তি পুলিশকে উৎসাহিত করতে পারে বৃহত্তর পুলিশি সংস্কৃতিতে মিশে যাওয়ার জন্য। যেমন- পুলিশে নিয়োগের সময় কেউ একজন হয়তো এমন চিন্তা করে পুলিশে আসল যে, সে কোন ঘুষ খাবে না। কিন্তু পুলিশি একতাবোধ তাকে পরিবর্তন করতে পারে ভিন্ন দিকে। বৃহত্তর পুলিশি সংস্কৃতি যদি হয় ঘুষ খাওয়ার সংস্কৃতি, তাহলে একতাবোধ তাকে ঘুষ খেতে উৎসাহিত করবে আর বৃহত্তর পুলিশি সংস্কৃতি যদি হয় সেবার সংস্কৃতি, তাহলে এই একতাবোধ তাকে সেবাধর্মী হতে অনুপ্রাণিত করবে।

৩. পুলিশি একতাবোধ পুলিশ ও জনগণের সম্পর্কে দূরত্ব বাড়িয়ে দিতে পারে এবং পুলিশে কোন বৈপ্লবিক পরিবর্তনকে বাধাগ্রস্থ করতে পারে। আসলে একতাবোধের গাঠনিক বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে তার আড়ালে বিচ্ছিন্নতাবোধের উপস্থিতি। পুলিশি একতাবোধ ও জনগণের সাথে এর দরুন তার বিচ্ছিন্ন হয়ে ওঠার সম্পর্ক বিশ্লেষণ করতে যেয়ে স্টিভ জেমস ও ইয়ান ওয়ারেন বলেন, 

‘The solidarity engendered by shared perceptions of danger and social isolation leads Police to adopt something of ‘Siege mentality’ reflected in beliefs by police that they are misunderstood and unappreciated by community at large (and in many cases by their department). In turn, a code of silence operates to protect even malpracticing police from external (and internal) security and criticism.’

জনগণ পুলিশকে ভুল বুঝে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে পুলিশ ডিপার্টমেন্টও পুলিশের প্রতি সদয় নয় এবং তাদের কাজের যোগ্য সম্মান ও সমর্থন তারা পান না। ফলে, কেবল আরেকজন পুলিশই বুঝে পুলিশের দুঃখ। এই দুঃখের ভাগাভাগি তৈরি করে একতাবোধ। কিন্তু এই একতাবোধ পুলিশি সমস্যার সমাধান নয় বরং এটি হল প্রবাহমান সমস্যা থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়া এবং উপরন্তু অনায্য সুবিধা নেয়ার একটি মাধ্যম। জনগণ যদি পুলিশকে ভুল বুঝে তাহলে এর সমাধান হবে জনগণের সাথে ঠিক বোঝাবোঝির সম্পর্ক পাতানো। ‘আমরা ও তারা’ এমন দ্বৈততামূলক বিভাজন সৃষ্টি না।

পুলিশি একতাবোধের বীজতলা হচ্ছে ঔপনিবেশিক শাসন। ১৮৮৪ সালের বাংলার স্থানীয় সরকার রিপোর্টের বরাত দিয়ে পিটার রব জানাচ্ছেন-

“To an extent, this reflected stereotyping by the British, who tended to regard the Bengalis as physically inferior to and, Because intellectually inclined, less reliable than some other Indian ‘races’, a factor which also influenced their expectation of the level of policing needed in Bengal.”

অর্থাৎ নির্ভরযোগ্য পুলিশ হচ্ছে সেই পুলিশ যার বুদ্ধিবৃত্তিক ঝোঁক নেই। বুদ্ধিবৃত্তিক ঝোঁক আসলে এখানে সমালোচনা, প্রশ্ন করার ক্ষমতা ইত্যাদি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ সেই কালেই পুলিশিংয়ের ধারণা ছিল পুলিশ পুলিশিং বা ব্যক্তি পুলিশের সমালোচনা করবে না। এখানে উল্লেখ থাকে যে, প্রায় সকল বাহিনীর বৈশিষ্ট্যই হচ্ছে একতাবোধ অর্থাৎ নিজেদের সমালোচনা থেকে দূরে থাকা। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া পুলিশের অফিসার পল স্ট্র্যাং এক সাক্ষাতকারে বলেন, পুলিশের গোন্ডেন রুল হল “Don’t rat on your mates”।

পুলিশ ও জনগণের দূরত্ব পুলিশি সংস্কৃতিকে ভিন্ন চেহারা দেয়। জনগণের সাথে পুলিশের দূরত্বের একেবারে মূল কারণ রাজনৈতিক। রাজনৈতিক আবহ ও দর্শনের পরিবর্তন ছাড়া এই দূরত্ব ঘুচবার নয়। বৃটিশ আমলে খুব সচেতনভাবে ‘সবচেয়ে করুনাময়’ শাস্তি হিসেবে ‘লাঠিচার্জে’র ব্যবস্থা করা হয়। ১৮৬০ সালের সিলেক্ট কমিটির মিটিংয়ের সভাপতি হিসেবে স্যার বার্নস পিকক এমন ব্যবস্থার প্রস্তাব করেন, যা ১৮৬২ সালে আইনের মর্যাদা পায়। পিকক তার প্রস্তাবনার পক্ষে বলেন,  

“In many parts of India, large bodies of natives regarded imprisonment as tantamount to the punishment of death… (and that therefore to such persons) Flogging was a most merciful punishment.”

ঐ একই কমিটির সদস্য স্যার বাটল ফ্রেয়া পিককের সাথে একমত পোষণ করে বলেন, Flogging was a very useful punishment, particularly in several parts of the country where the people were in a state of semi-barbarism.”

সুতরাং, এই অঞ্চলে আধুনিক পুলিশিংয়ের সূচনা তাদের মতে ‘আধা বর্বর’ মানুষদের লাঠিচার্জ করার মাধ্যমে এবং এই লাঠিচার্জ ছিল জেলের বিকল্প। অর্থাৎ বিচারিক প্রক্রিয়ার সাধারণ বিকল্প ছিল লাঠিচার্জ। এখন যখন আমাদের দেশে আমরাই ক্ষমতার অধিপতি, তখন পুলিশ ও জনগণের সম্পর্ক পরিবর্তিত হওয়ার কথা। যার জন্য বৃহত্তর উদ্যোগ প্রয়োজন। যেমন, ৯৯৯ বলে জাতীয় জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠা বা বিট পুলিশিং, হ্যালো ওসি এই ধরনের উদ্যোগ। কিন্তু তারও আগে সমস্যা নির্ণয় অধিক জরুরি। অর্থাৎ এমন গবেষণা প্রয়োজন যার মাধ্যমে জানা যাবে, পুলিশকে নিয়ে জনগণের আপত্তিগুলো কোথায় কোথায় এবং তাদের চাওয়াগুলো কী কী এবং এই গবেষণা হওয়া উচিত আঞ্চলিক এবং ব্যক্তিগত পর্যায়ে। যাতে আঞ্চলিক চাহিদা উপেক্ষিত না হয় এবং স্বতন্ত্র ব্যক্তির চাওয়াটা অন্তত পুলিশের গোচরে আসে। পুলিশি সংস্কৃতির গুণগত পরিবর্তন সাধনে যা প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখতে পারে।

উপসংহার : পুলিশি সংস্কৃতি অনেক ব্যাপক একটা ধারণা। এই ধারণা সম্পর্কিত আলোচনার পরিধি বিশাল। নিয়োগের পর ব্যক্তি কীভাবে ‘পুলিশ’ হয়ে ওঠে, পুলিশি অপরাধ তার গোষ্ঠীতে কীভাবে বৈধতা পায় বা সমালোচিত হয়, ঔপনিবেশিক মানসিকতা কীভাবে পুলিশকে প্রভাবিত করে, ‘ম্যাচো ম্যান’ ইমেজ কীভাবে পুলিশের কর্ম ব্যক্তিত্ত্বকে প্রভাবিত করে, পুলিশি দুর্নীতির সামাজিক কারণ ইত্যাদি নানা বিষয় পুলিশি সংস্কৃতি পাঠের অন্তর্গত। পুলিশি সংস্কৃতির এইসব সাধারণভাবে উপেক্ষিত বিষয়ের পাঠ ছাড়া পুলিশিংয়ে গুণগত পরিবর্তনের যে কোন চেষ্টা ব্যর্থ হতে বাধ্য। বাংলাদেশের পুলিশি সংস্কৃতি ব্যাপকভাবে উপনিবেশের উত্তরাধিকার বহন করে যার আরো বিস্তৃত পাঠ জরুরি।

তথ্যসূত্র:

Anupama Rao, Problems of Violence, States of Terror: Torture in Colonial India, EPW

“চুলে ‘বখাটে কাটিং’ না দিতে সেলুনে পুলিশের নির্দেশনা”, প্রথম আলো, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৯

“ওসির কক্ষে ঢুকতে লাগে না অনুমতি, ডাকতে হয় না স্যার”, ঢাকা ট্রিবিউন বাংলা, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২০

নাপিতকে চিকিৎসকের বিয়ে, মানতেই পারছেন না সিআইডির এই এসপি”, প্রথম আলো, ২৭ ডিসেম্বর ২০২০

Peter Robb, “The Ordering of Rural India; The policsing of nineteenth-century Bengal and Bihar”, Policing the Empire (Ed. Anderson and Killingray) Manchester University Press, 1991

Steve James and Ian Warren, Police Culture, Journal of Australian Studies, V-19 I-43, 1995

Peter B. Kraska, “Militarization and Policing- Its Relevance to 21st Century Police”, policing.oxfordjournals.org

প্রবন্ধটি রাষ্ট্রচিন্তা জার্নাল, বর্ষ ৫, সংখ্যা ১, জানুয়ারি ২০২১-তে প্রথম প্রকাশিত হয়। 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *